Skip to content
Zero Travel

দ্যা গ্রেট গেমঃ আ ম্যান নেমড আফগানি

দ্যা গ্রেট গেমঃ আ ম্যান নেমড আফগানি

আপনারা যদি গত ৫০০ বছরের ইতিহাস নিয়ে বসেন এবং বুঝার চেষ্টা করেন কোন ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া মানব জাতির ইতিহাসকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিলো…তার মাঝে একদম শুরুর দিকেই থাকবে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ।

আপনারা আমাকে ভুল বুঝতে পারেন। ভাবতে পারেন দক্ষিণ এশিয়ার একটা দেশের বাসিন্দা হবার কারণে আমি সিপাহী বিদ্রোহের মতো স্থানীয় একটা বিদ্রোহকে অনেক বড় করে দেখাতে চাচ্ছি।

হ্যা…সেটা আপনারা বলতেই পারেন।

কিন্ত সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন…এর ভেতরে একটা শ্রেণী সংগ্রাম লুকিয়ে আছে।

শ্রেণী সংগ্রামের ধারণা তখনো দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি। কার্ল মার্ক্স তখন লন্ডনে বসে আমেরিকার এক পত্রিকায় কলাম লিখছেন।

কি নিয়ে জানেন? এই বিদ্রোহ নিয়েই।

এক দিকে কৃষকের ছেলে সিপাহি। খাজনার চাপে পিষ্ট কৃষক। আরেক দিকে রাজ্য হারানো রাজা-রানি আর জমিদারি হারানো তালুকদার। আলাদা আলাদা লড়াই। কিন্ত শত্রু এক।

এই বিদ্রোহে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে যোগ দিয়েছিলো। তারা একসাথে লড়েছে। এবং মরেছে।

সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার কারণগুলোর মাঝে একটা হতে পারে সেই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের এলিটদের একটা বড় অংশের বিরোধিতা। বিশেষ করে উঠতি ব্যবসায়ী আর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, যাদের স্বার্থ তখন ব্রিটিশদের সাথে বাঁধা।

কিন্ত সিপাহী বিদ্রোহ এমন একজন মানুষকে ভয়ংকরভাবে আলোড়িত করেছিলো…যার কাজ আর ভাবনা-চিন্তা পরে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার এমন সব মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে…যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে খুব বিরল।

চলেন…মানুষটার গল্প শুনি।

_________

১৮৫৯ সাল।

মাত্রই সিপাহী বিদ্রোহ দমন করা হয়েছে। তখনও বিদ্রোহের ধ্বংসস্তূপ আর লাশের গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। ব্রিটিশরা আতঙ্কিত। বিদ্রোহের আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরে।

তাদের গোয়েন্দারা ঘুরে বেড়ায় ব্রিটিশ ভারতের পথে পথে।

এমনই এক ব্রিটিশ গোয়েন্দার রিপোর্টে উঠে আসে এক অদ্ভুত তরুণের কথা। বয়স বিশের আশেপাশে। নিজেকে পরিচয় দেয় আফগান হিসেবে। মানুষটা ফার্সি, আরবি আর তুর্কিতে অনর্গল কথা বলতে পারে। কিন্ত পোশাক মধ্য এশিয়ার নোগাই গোত্রের।

রিপোর্টে সন্দেহ করা হলো…এই লোক খুব সম্ভবত রাশিয়ান গুপ্তচর।

এই মানুষটার নাম জামাল-আল-দিন-আল-আফগানি।

আরব্য রজনীর গল্পের মতো রোমাঞ্চকর তার জীবন। রহস্যে ঘেরা তার মৃত্যু। আপনি যদি তার সম্পর্কে পড়তে যান…আপনার মনে হবে একটা জমজমাট থ্রিলার পড়ছেন।

মানুষটা বারবার পরিচয় বদলেছে। যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত।

আর যেখানে গেছে, পেছনে রেখে গেছে আগুন।

________

আফগানির পরিচয় নিয়ে রহস্য আছে। এবং সেই রহস্য সৃষ্টি করেছে সে নিজেই।

আফগানি সারা জীবন নিজেকে আফগানিস্তানে জন্ম নেওয়া সুন্নি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। কিন্ত বেশিরভাগ গবেষকের মতে তার জন্ম ইরানের হামাদানের কাছে আসাদাবাদ গ্রামে। এক শিয়া পরিবারে। পড়াশোনাও শিয়া মাদ্রাসায়, ইরাকের শিয়া তীর্থনগরীগুলোতে।

তাহলে “আফগানি” কেন?

কারণ সুন্নি দুনিয়ায় একজন ইরানি শিয়ার কথা কেউ শুনবে না। একজন আফগান সুন্নির কথা শুনবে।

আর মজার ব্যাপার হলো, যখন সে সত্যি সত্যি আফগানিস্তানে গেলো…সেখানে সে নিজের পরিচয় দিলো ইস্তাম্বুল থেকে আসা মানুষ হিসেবে।

যেখানে যে পরিচয় কাজে লাগে। সেখানে সেই পরিচয়।

__________

জানা যায়, ১৮৫৬-৫৭ সালে আফগানি ব্রিটিশ ভারতে আসে। এর কিছুদিনের মাঝে সিপাহী বিদ্রোহ হয়। ব্রিটিশরা পুরো বিদ্রোহ খুব নির্মমতার সাথে দমন করে।

এই নিষ্ঠুরতা খুব সম্ভবত আফগানির মনে তীব্র আলোড়ন তোলে।

ইতিহাসবিদ এরভান্দ আব্রাহামিয়ানের মতে, বিদ্রোহের ব্যর্থতা দেখে আফগানি তিনটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলো।

এক, ভারত গিলে খাওয়ার পর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পরের লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য।

দুই, পশ্চিমের আধুনিক প্রযুক্তি দ্রুত না নিলে এশিয়া এই আগ্রাসন ঠেকাতে পারবে না।

তিন, ইসলাম…যতোই ঐতিহ্যবাদী হোক…সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগানোর সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।

তৃতীয় সিদ্ধান্তটা মনে রাখবেন। এই সিরিজের পুরো গল্পটা এই এক লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে।

আর একটা কথা। এই আফগানিই বিশ্বাস করতো, ভারতে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করতে হলে হিন্দু আর মুসলমানকে একসাথে লড়তে হবে।

ঠিক যেমনটা লড়েছিলো ১৮৫৭-তে।

_______

যাই হোক। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন হয়ে দাঁড়ালো তার জীবনের ব্রত।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একদিন ঠিকই ভেঙেছে।

কিন্ত সেই তরুণের জ্বালানো আগুন…সেটা আজও নেভেনি।

________

ব্রিটিশ ভারতের পর আফগানি কোথায় গেলো, সে সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। মাঝে কয়েক বছরের হিসাব নেই। খুব সম্ভবত হজ্জ, তারপর উসমানি সাম্রাজ্যের নানা শহর।

১৮৬৬ সালে তাকে দেখা যায় আফগানিস্তানে। বয়সে তরুণ। কিন্ত অল্প দিনের মাঝেই সে আফগান দরবারের উপদেষ্টা হয়ে গেছে।

সেই সময় আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ চলছিলো। এই গৃহযুদ্ধে আফগানি মোহাম্মদ আজম খানকে সমর্থন দেয়। আজম খানকে বুঝাবার চেষ্টা করে রাশিয়ানদের সাহায্য নিয়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য। কিন্ত ১৮৬৮ সালে ব্রিটিশদের সমর্থনে শের আলি খান যুদ্ধে জিতে যায়।

শের আলি আফগানিকে দেশ থেকে বের করে দেয়।

___________

এবার আমরা চলে যাবো সরাসরি মিশরে। মাঝে ইস্তাম্বুল আছে। কিন্ত আফগানির ইতিহাস লিখার কাজ শুরু হয় মিশর থেকেই।

ইস্তাম্বুল যাবার পথে ১৮৬৯ সালে আফগানি কিছুদিন কায়রোতে থেমেছিলো। সেই অল্প কয়েকদিনেই তার দেখা হয় এক তরুণের সাথে।

নাম তার মুহাম্মদ আবদুহু।

নীল নদের বদ্বীপের এক গ্রামের কৃষক পরিবারের ছেলে। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় পাঠানো হয়েছিলো। কিন্ত না বুঝে মুখস্থ করার পড়াশোনা তার এতোটাই অসহ্য লাগতো যে একবার পালিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছিলো। ঠিক করেছিলো চাষাবাদ করবে, পড়াশোনা আর না।

এক সুফি চাচার হাত ধরে সে আবার পড়াশোনায় ফেরে। জায়গা পায় আল-আজহারে। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে মর্যাদার বিদ্যাপীঠ।

কিন্ত আল-আজহারেও সে হাঁপিয়ে ওঠে। একই মুখস্থ বিদ্যা। একই শত বছরের পুরনো ব্যাখ্যার ব্যাখ্যা।

তারপর সে দেখা পেলো এক বিদেশি লোকের। যে দর্শন পড়ায়, যুক্তি পড়ায়, ইবনে সিনা পড়ায়। আর কথা বলে এমনভাবে যেন পুরো মুসলিম বিশ্বকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলবে।

১৮৭১ সালে ইস্তাম্বুল থেকে বিতাড়িত হয়ে আফগানি যখন আবার কায়রোতে ফিরলো…আবদুহু এসে বসলো তার পায়ের কাছে।

পরের আট বছর আবদুহু ছিলো তার সবচেয়ে কাছের ছাত্র।

আল-আজহারের আলেমরা আফগানিকে পছন্দ করতো না। দর্শন পড়ানো তাদের চোখে বিপজ্জনক।

কিন্ত তরুণরা দলে দলে আসতে থাকলো। কায়রোর ক্যাফেতে বসে আফগানি তাদের শোনাতো সাম্রাজ্যবাদ, স্বাধীনতা আর জাগরণের গল্প।

এই তরুণদের মাঝে আবদুহু হয়ে উঠলো সবচেয়ে উজ্জ্বল।

__________

আপনারা অনেকেই গুপ্ত সংস্থা “ফ্রি মেসনারি” এর নাম শুনে থাকবেন। কন্সপিরেসি থিওরির প্রিয় বিষয়। গোপন প্রতীক, গোপন শপথ, গোপন সভা।

আপনারা জেনে অবাক হবেন, আমাদের আফগানি নিজেও ফ্রি মেসনারির সদস্য ছিলো।

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সেই সময়ের মিশরে এটা খুব অস্বাভাবিক কিছু ছিলো না। কায়রো আর আলেকজান্দ্রিয়ার মেসনিক লজগুলো ছিলো শহরের এলিটদের আড্ডাখানা। ব্যবসায়ী, অফিসার, বুদ্ধিজীবী, এমনকি রাজপরিবারের লোকজনও সেখানে যেতো। লজের বন্ধ দরজার ভেতরে গড়ে উঠতো এমন সব যোগাযোগ, যা বাইরে গড়া কঠিন।

আফগানি ঠিক এটাই চাইছিলো। একটা নেটওয়ার্ক। প্রভাবশালী মানুষের নেটওয়ার্ক।

১৮৭৫ সালের দিকে সে যোগ দেয় একটা ব্রিটিশ-অনুমোদিত লজে। খুব দ্রুত নেতৃত্বেও উঠে আসে। কিন্ত কিছুদিনের মাঝেই হতাশ হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ লজের নিয়ম…

“রাজনীতি নিয়ে কথা বলা যাবে না।”

আফগানির জবাব ছিলো, এই দেশে অনেক অদ্ভুত জিনিস দেখেছি। কিন্ত কখনো ভাবিনি মেসনদের সারিতেও ভীরুতা এভাবে ঢুকে পড়বে।

আফগানির কাছে রাজনীতি ছাড়া মেসনারি অর্থহীন।

তাই সে ব্রিটিশ লজ ছেড়ে চলে যায় ফরাসি ধারার মেসনারিতে। এবং নিজেই গড়ে তোলে নতুন লজ।

সূত্রমতে কয়েকশো সদস্য। মিশরের তরুণ অফিসার, আলেম, সাংবাদিক। তার ছাত্ররা। বিচিত্র সব মানুষ এসে ভিড় করে তার লজে।

এই বিচিত্র মানুষদের একজন ছিলো মিশরের শাসক খেদিভ ইসমাইলের ছেলে। যুবরাজ তাওফিক।

তাওফিক নিজেও মেসন। আফগানি ভাবলো এই যুবরাজই হবে তার তুরুপের তাস।

ইসমাইলকে সরিয়ে তাওফিককে বসাও, তারপর তাওফিককে দিয়ে সংস্কার করাও।

__________

মিশর তখন নামে উসমানি সাম্রাজ্যের অংশ। কিন্ত শাসন করে খেদিভ। খেদিভ ইসমাইলের স্বপ্ন ছিলো মিশরকে ইউরোপ বানাবেন। কায়রোতে প্যারিসের মতো রাস্তা, অপেরা হাউজ, প্রাসাদ। আর সুয়েজ খাল।

স্বপ্নের দাম মেটাতে গিয়ে মিশর ডুবে গেলো ইউরোপীয় ব্যাংকের ঋণে। ১৮৭৫ সালে দেনা শোধ করতে সুয়েজ খালের শেয়ার বিক্রি করে দিতে হলো ব্রিটেনের কাছে। তাতেও হলো না।

এরপর ব্রিটেন আর ফ্রান্স এসে বসলো মিশরের কোষাগারে। মিশরের বাজেট কে বানাবে, ট্যাক্স কতো হবে, কার বেতন কাটা হবে…সব ঠিক করে দেয় ইউরোপীয় অফিসাররা।

একটা দেশ গুলি না খেয়েই দখল হয়ে গেলো। ঋণের কাছে।

________

খেদিভ ইসমাইল ঋণে ডুবে গেলেও সহজে হার মানার লোক ছিলেন না। ১৮৭৮ সালে ইউরোপের চাপে তাকে এমন এক মন্ত্রিসভা মেনে নিতে হলো, যেখানে অর্থমন্ত্রী একজন ব্রিটিশ আর পূর্তমন্ত্রী একজন ফরাসি। লোকে বলতো “ইউরোপীয় মন্ত্রিসভা”। মিশরের মন্ত্রণালয়ে বসে বিদেশিরা মিশরীয় অফিসারদের বেতন কাটছে।

১৮৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ছাঁটাই হওয়া অফিসাররা কায়রোতে প্রধানমন্ত্রী নুবার পাশাকে রাস্তায় ঘেরাও করে হেনস্তা করলো। অনেকের ধারণা, পর্দার আড়ালে এটা সাজিয়েছিলেন ইসমাইল নিজেই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি ইউরোপীয় মন্ত্রীদের বিদায় করে দিলেন আর সংবিধানের কথা বলতে শুরু করলেন।

ব্রিটেন আর ফ্রান্স বুঝলো, এই খেদিভ আর তাদের কথা শুনবে না।

তারা গেলো ইস্তাম্বুলে। কাগজে-কলমে মিশরের মালিক তখনও উসমানি সুলতান। সুলতান আব্দুল হামিদ ১৮৭৯ সালের জুনে ফরমান জারি করলেন: ইসমাইল বরখাস্ত।

টেলিগ্রামটা পাঠানো হয়েছিলো “সাবেক খেদিভ ইসমাইল”-এর নামে। খবরটা তিনি জানলেন নিজের পদবির আগে “সাবেক” শব্দটা দেখে।

কয়েকদিন পর ইসমাইল নিজের রাজকীয় ইয়টে চড়ে চলে গেলেন ইতালির নেপলসে। আর কোনোদিন মিশরে শাসক হিসেবে ফেরেননি।

সিংহাসনে বসলেন তার ছেলে তাওফিক। বয়স মাত্র ২৬।

__________

আফগানি এই দিনটার জন্যই অপেক্ষা করছিলো।

তাওফিক তার মেসনিক নেটওয়ার্কের লোক। যুবরাজ থাকার সময় সংস্কারের কথায় সায় দিতেন। আফগানি আর তার ছাত্ররা ইসমাইলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই প্রচার চালাচ্ছিলো। বলা হয়, আফগানি এমনকি ইসমাইলকে হত্যার কথাও ভেবেছিলো।

ইসমাইলের পতনে আফগানির ভূমিকা কতোটা ছিলো, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে তর্ক আছে। কেউ বলে মূল খেলোয়াড় আফগানি। কেউ বলে আসল খেলাটা হয়েছে লন্ডন, প্যারিস আর ইস্তাম্বুলে।

কিন্ত আফগানি ভেবেছিলো, নতুন খেদিভ মানে নতুন মিশর। সংবিধান, সংসদ, ইউরোপের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি।

তাওফিক অবশ্য জানতেন তিনি কার জোরে সিংহাসনে বসেছেন। সুলতানের ফরমান এসেছে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের চাপে। যারা তাকে বসিয়েছে, তারা চাইলে নামাতেও পারবে।

ক্ষমতায় বসেই তাওফিক সংবিধানের প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন।

আর এদিকে ব্রিটিশ কনসাল চাইছিলো একটা জিনিস: কায়রোর ক্যাফেতে যে বিদেশি লোকটা তরুণদের মাথায় আগুন ঢুকাচ্ছে, তাকে সরাও।

কারণ….চিন্তা সংক্রামক।

__________

১৮৭৯ সালের আগস্টের শেষ দিকের এক রাতে আফগানিকে তার বাসা থেকে তুলে নেওয়া হলো। কোনো বিচার না, কোনো শুনানি না। সোজা সুয়েজে নিয়ে গিয়ে জাহাজে তুলে দেওয়া হলো ভারতের পথে।

পরদিন সরকারি ঘোষণায় বলা হলো, এই লোক একদল উচ্ছৃঙ্খল তরুণকে নিয়ে “গোপন সংগঠন” চালাচ্ছিলো, যাদের উদ্দেশ্য ধর্ম আর দুনিয়া দুটোকেই নষ্ট করা।

গোপন সংগঠন। মানে সেই লজ। যার একজন সদস্য ছিলেন এই খেদিভ নিজেই।

মেসনিক ভাই। কিন্ত আগে রাজা।

শিষ্যরাও রেহাই পেলো না। আবদুহুকে শিক্ষকতা থেকে সরিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হলো তার গ্রামে, এক রকম নজরবন্দি অবস্থায়।

যে যুবরাজকে আফগানি নিজের তুরুপের তাস ভেবেছিলো, সিংহাসনে বসার দুই মাসের মাথায় সেই তাসেই সে খেলা থেকে বাদ পড়ে গেলো।

__________

আফগানি মিশর ছাড়লো। কিন্ত পেছনে রেখে গেলো তার ছাত্রদের।

এই ছাত্রদেরই একজন চল্লিশ বছর পর এমন এক বিপ্লবের নেতা হবে, যেখানে মসজিদের ইমাম যাবে গির্জায় বক্তৃতা দিতে…আর গির্জার পাদ্রি উঠবে আল-আজহারের মিম্বারে।

এরা আজকের আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যাদের বাদ দিয়ে আপনি বর্তমান বাস্তবতা বুঝবেন না। কিন্ত সেই গল্পে যাবার আগে আমাদের জানতে হবে উরাবির কথা।

উরাবির বিদ্রোহের কথা।

________

মিশরের সেনাবাহিনীতে বড় বড় পদগুলো ছিলো সব তুর্কি আর সার্কাসিয়ান অভিজাতদের দখলে। মিশরের মাটির ছেলেরা, কৃষকের ছেলেরা যতোই যোগ্য হোক…একটা পর্যায়ের পর আর উঠতে পারে না। আর ঋণ শোধের নামে যখন বাজেট কাটা হলো, সবার আগে ছাঁটাই হলো এই মিশরীয় অফিসাররাই।

এমনই এক কৃষকের ছেলে কর্নেল আহমেদ উরাবি।

১৮৮১ সালের সেপ্টেম্বর। উরাবি সৈন্য নিয়ে ঘেরাও করলেন খেদিভ তাওফিকের প্রাসাদ।

হ্যা, সেই তাওফিক।

দাবি: মন্ত্রিসভা ভাঙতে হবে, সংসদ দিতে হবে, সংবিধান দিতে হবে।

বলা হয়, খেদিভ জবাব দিয়েছিলো…

وَرِثْتُ الأَرْضَ وَمَنْ عَلَيْهَا، وَمَا أَنْتُمْ إِلَّا عَبِيدِي

(ওয়ারিসতুল আরদা ওয়া মান আলাইহা, ওয়া মা আনতুম ইল্লা আবীদী।)

– এই মাটি আর তার ওপরের সবকিছু আমার উত্তরাধিকার। তোমরা আমার দাস ছাড়া কিছু না।

উরাবি জবাব দিলেন…

لَسْنَا تُرَاثًا وَلَا عَقَارًا، خَلَقَنَا اللّٰهُ أَحْرَارًا

( লাসনা তুরাসান ওয়া লা আকারা, খালাকানাল্লাহু আহরারা।)

আমরা কারো উত্তরাধিকার নই, কারো জমিজমা নই। আল্লাহ আমাদের স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন।

________

মিশরের ইতিহাসে এই মুহূর্তটা আজও কিংবদন্তি।

খেদিভ পিছু হটলো। উরাবি হলেন যুদ্ধমন্ত্রী। রাস্তায় রাস্তায় স্লোগান উঠলো…

مِصْرُ لِلْمِصْرِيِّين

মিসরু লিল-মিসরিয়্যীন।

মিশর মিশরীয়দের জন্য।

খেয়াল করবেন। স্লোগানটা ইসলামের না। মিশরের।

আর এই আন্দোলনের ভেতরে ছিলো আমাদের পুরনো চেনা মুখ। আবদুহু।

__________

গ্রামের নজরবন্দি দশা বেশিদিন থাকেনি। ১৮৮০ সালে তাকে ফিরিয়ে এনে বসানো হয় সরকারি গেজেটের সম্পাদকের চেয়ারে। সেই চেয়ারে বসে আবদুহু কলম চালাচ্ছিলো সংস্কার আর স্বাধীনতার পক্ষে। উরাবির বিদ্রোহে সে দাঁড়ালো উরাবির পাশে।

কিন্ত এই স্লোগান ব্রিটিশদের পছন্দ হলো না।

সুয়েজ খাল ভারতে যাবার পথ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গলার রগ। এটা এরকম স্বাধীনচেতা কারো হাতে থাকলে সমস্যা।

আর ইউরোপীয় ঋণদাতাদের টাকা আটকে আছে মিশরে।

১৮৮২ সালের জুলাই। ব্রিটিশ নৌবাহিনী আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গোলাবর্ষণ শুরু করলো। শহর জ্বললো।

এরপর সেপ্টেম্বরে তেল-এল-কেবিরের যুদ্ধ। ভোর হবার আগেই ব্রিটিশরা হামলা চালালো। এক ঘণ্টারও কম সময়ে উরাবির বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো।

উরাবিকে নির্বাসনে পাঠানো হলো সিলোনে। আজকের শ্রীলঙ্কায়। আর মিশর চলে গেলো ব্রিটিশ দখলে। যে দখল চলবে প্রায় ৭০ বছর।

__________

আফগানি নিজে তখন মিশরে নেই। কিন্ত বিদ্রোহের মাঠে ছিলো তার ছাত্ররা। কায়রোর ক্যাফেতে বসে যারা তার কাছে স্বাধীনতার পাঠ নিয়েছিলো।

উরাবির পতনের পর আবদুহুকে জেলে যেতে হলো। তারপর নির্বাসনে।

__________

জাতীয়তাবাদ ফেইল করলো। এবার ধর্ম।

উরাবির পরাজয় আফগানিকে আবার সেই পুরনো শিক্ষার কাছে ফিরিয়ে নিলো। ১৮৫৭-র ভারত থেকে পাওয়া সেই তৃতীয় সিদ্ধান্তের কাছে।

“মিশর মিশরীয়দের জন্য” দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে হারানো যাবে না। মিশর একা লড়লে মিশর হারবে। ভারত একা লড়লে ভারত হারবে। ইরান একা লড়লে ইরান হারবে।

দরকার এমন কিছু, যা মিশরী, ভারতীয়, ইরানি, তুর্কি, আফগান সবাইকে এক পতাকার নিচে আনবে।

জাতীয়তাবাদ সেটা পারবে না।

কিন্ত ধর্ম পারবে।

আফগানি তার খেলার স্টাইল বদলে ফেললো। যার ফলাফল প্রত্যক্ষ করছে বর্তমান দুনিয়াও।

মিশর জ্বলছে।

সময়টা ১৮৮১ থেকে ১৮৮২ সালের মাঝে।

মিশরীয় কর্নেল আহমেদ উরাবি খেদিভের প্রাসাদ ঘেরাও করেছেন। তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফগানির ছাত্ররা। তাদের মুখে স্লোগান: “মিশর মিশরীয়দের জন্য”। আফগানির প্রিয় ছাত্র আবদুহুও উরাবির পাশে।

আর আফগানি কোথায়?

কলকাতায়। ব্রিটিশদের নজরবন্দি। যতদিন না মিশরের বিদ্রোহ শেষ হয়।

ভাবুন একবার।

যে বিপ্লবের বীজ সে নিজের হাতে বুনেছে, সেই বিপ্লব ফসল দিচ্ছে হাজার মাইল দূরে। আর সে কলকাতার এক ঘরে বসে খবরের কাগজে পড়ছে আলেকজান্দ্রিয়ায় ব্রিটিশ কামানের গোলা পড়ার খবর।

⸻

কলকাতায় আসার আগে আফগানি প্রায় দুই বছর কাটিয়েছে হায়দ্রাবাদে। নিজামের রাজ্যে।

আর সেখানে বসে সে যা লিখেছে, শুনলে আপনি অবাক হবেন।

একটা ফার্সি পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ। সেই প্রবন্ধগুলোতে ইসলামি ঐক্যের ছিটেফোঁটাও নেই। বরং আফগানি লিখছে…ভাষার বন্ধন ধর্মের বন্ধনের চেয়ে বেশি শক্তিশালী। বেশি টেকসই।

ভারতের মুসলমানদের এক হতে হবে বিদেশি মুসলমানদের সাথে না…ভারতের হিন্দুদের সাথে। ব্রিটিশকে হারাতে হলে হিন্দু-মুসলমান একসাথে।

১৮৫৭-র সেই শিক্ষা। মনে আছে?

⸻

ভারতে বসে আফগানি আরেকটা কাজ করে যাচ্ছিলো।কলম চালাচ্ছিলো আরেক ভারতীয় মুসলিমের বিরুদ্ধে।

নাম তার: স্যার সৈয়দ আহমদ খান।

নামটা পরিচিত লাগছে?

লাগার কথা। ছোটবেলায় সমাজ বইয়ে উনার কথাই পড়েছেন।

স্যার সৈয়দ বলছেন: মুসলমানদের ইংরেজি শিখতে হবে, বিজ্ঞান শিখতে হবে, ব্রিটিশদের সাথে মিলেমিশে চলতে হবে।

অন্যদিকে আফগানির রাজনীতির কেন্দ্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিহত করার সংগ্রাম।

আফগানি ভয়াবহভাবে আক্রমণ করলো স্যার সৈয়দকে। প্রকৃতিবাদী। বস্তুবাদী। ব্রিটিশদের হাতের পুতুল। নানা উপাধি দিলো মানুষটাকে।

এই ঘটনা মনে রাখেন। পরে কাজে লাগবে।

⸻

১৮৮২ সালে উরাবি বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। তেল-এল-কেবিরে এক ঘণ্টার কাছাকাছি যুদ্ধ। মিশরের সেনাবাহিনী পরাজিত।

ব্রিটিশরাও আফগানির ওপর থেকে নজরদারি তুলে নিলো। এখন আর তাকে নিয়ে ভয় পাবার কিছু নাই।

ভুল হিসাব।

………

১৮৮৩ সালের শুরুতে আফগানি পৌঁছালো প্যারিসে।

আর প্যারিসে এসে আফগানি এমন একটা কাজ করলো, যা সে এর আগে প্রকাশ্যে করেনি।

সে ইসলামের নামে ডাক দিলো।

কাবুলে সে ছিলো রাজনৈতিক উপদেষ্টা। কায়রোতে মিশরীয় জাতীয়তাবাদের শিক্ষক। হায়দ্রাবাদে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা।

ইতিহাসবিদ নিকি কেডি দেখিয়েছেন, প্যারিসের আগে আফগানি যে দেশে গেছে, সেই দেশের জাতীয়তাবাদের সাথেই নিজেকে মিলিয়েছে।

কিন্ত প্যান-ইসলামের কথা প্রকাশ্যে বলা শুরু করেছে ১৮৮৩ সালের পরে। অনেকটা তুর্কি চিন্তাবিদ নামিক কামালের দেখানো পথে।

কেন?

উরাবি। এক ঘণ্টা।

মিশরের জাতীয়তাবাদ সামরিকভাবে পরাজিত। ভারতের হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ১৮৫৭-তে রক্তে ডুবেছে। আফগানিস্তানে ব্রিটিশ প্রভাব বিস্তারের সংগ্রাম চলছে। তিউনিসিয়া ফরাসিদের দখলে।

একা একা কেউ পারছে না।

দরকার এমন একটা পতাকা, যার নিচে কায়রো, কাবুল, কলকাতা, ইস্তাম্বুল সবাই দাঁড়াবে।

সেই পতাকার নাম ইসলাম।

⸻

আফগানির প্রিয় ছাত্র আবদুহু তখন বৈরুতে নির্বাসিত।

আফগানি খবর পাঠালো। চলে আসো। আবার নতুন করে শুরু করি।

আবদুহু বৈরুতে এলো।

১৮৮৪ সালে দুজনে মিলে বের করলো আরবি পত্রিকা “আল-উরওয়া আল-উসকা”। যার বাংলা: দৃঢ় বন্ধন। নামটা কুরআনে ব্যবহৃত একটা শব্দবন্ধ থেকে নেওয়া।

শুরু হলো পত্রিকার সার্কুলেশন। বিক্রি না, বিনা পয়সায় পাঠানো হতো মুসলিম দুনিয়ার প্রভাবশালী মানুষদের কাছে।

ভাবনা আফগানির। কলম আবদুহুর।

পত্রিকার বক্তব্য পরিষ্কার: মুসলিম দুনিয়া এক হও।

হায়দ্রাবাদে যে লোক লিখেছিলো ভাষার বন্ধন ধর্মের চেয়ে শক্তিশালী…মাত্র কয়েক বছর পর প্যারিসে সে লিখছে ঠিক উল্টো কথা।

কিন্ত…আফগানি কি আসলেই ইসলামিস্ট?

নাকি ইসলাম তার কাছে শুধুই একটা ইন্সট্রুমেন্ট? ব্রিটিশদের পরাজিত করার?

এর উত্তর পেতে আমাদের এক বছর পিছিয়ে যেতে হবে।

⸻

১৮৮৩ সালের মার্চ। প্যারিসের সরবোন।

ফ্রান্সের বিখ্যাত চিন্তাবিদ আর্নেস্ট রেনান বক্তৃতা দিলেন: “ইসলাম আর বিজ্ঞান।” রেনানের বক্তব্য: ইসলাম আর বিজ্ঞান একসাথে চলতে পারে না। মুসলিম দুনিয়ার পশ্চাৎপদতার কারণ ইসলাম নিজেই।

মে মাসে আফগানি জবাব দিলো। ফরাসি ভাষায়। ফরাসি পত্রিকায়।

মুসলিম দুনিয়া যদি জানতো আফগানি কী লিখেছে, তাহলে সে আর কোনোদিন কোনো মসজিদে পা রাখতে পারতো কি না আমার সন্দেহ আছে।

ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে…আফগানি রেনানের বক্তব্য পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি। ধর্মীয় কর্তৃত্বের সাথে বিজ্ঞান আর দর্শনের সংঘাতের অনেকটাই সে মেনে নিয়েছে।

সে লিখলো, সে নিজেও দর্শন আর বিজ্ঞানের পক্ষে। কিন্ত সাধারণ মানুষ দর্শন বোঝে না, বিজ্ঞান বোঝে না। তারা নড়ে ধর্মের কথায়। যুক্তি আর বিজ্ঞানের কথা গভীরভাবে বোঝে অল্প কিছু এলিট।

আর ধর্ম কেন দরকার? সাধারণ মানুষকে নৈতিক রাখতে। বাধ্য রাখতে।

তবে আফগানি এটাও বলেছে, মুসলিম সমাজ চিরকাল এমন থাকবে না। ইউরোপের মতো তারাও একদিন বিজ্ঞানের পথে এগোতে পারে।

কিন্ত ধর্ম সত্য কিনা, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে আরেকটা প্রশ্ন।

ধর্ম কাজে লাগে কিনা।

………

এবার স্যার সৈয়দের কথাটা মনে করেন।

যে মানুষ ভারতে বসে স্যার সৈয়দকে বস্তুবাদী বলে গালি দিলো…সেই মানুষ প্যারিসে বসে ধর্মের সামাজিক উপযোগিতা ব্যাখ্যা করছে।

কেডির মতে, স্যার সৈয়দের যুক্তিবাদ আর সংস্কারের চিন্তা আফগানি নিজেও অনেকাংশে ধারণ করতো। তার আপত্তি ছিলো প্রধানত রাজনীতিতে।

স্যার সৈয়দ ব্রিটিশপন্থী।

আর ব্রিটিশপন্থী কারো প্রভাব ভাঙতে হলে তাকে ধর্মের শত্রু হিসেবে তুলে ধরা কার্যকর অস্ত্র হতে পারে।

⸻

এবং এখানেই আসল চমক।

রেনানকে দেওয়া সেই জবাব আরবিতে প্রকাশিত হলো না।

কেডির মতে, আফগানি আর আবদুহু দুজনেই এই লেখাটি আরবি পাঠকদের কাছ থেকে দূরে রেখেছিলেন।

পরে আবদুহু তার ওস্তাদের আরবি জীবনী লিখলেন। সেখানে আফগানি একজন নিখাদ ধর্মপ্রাণ মুসলমান। প্যারিসের সেই লেখার কোনো ছায়া নেই।

পরবর্তী অনেক জীবনী দাঁড়িয়ে গেলো এই বিবরণের ওপর।

একজন মানুষ দুইটা ভাষায় দুই রকম কথা বলছে। আর তার সবচেয়ে কাছের ছাত্রের লেখা জীবনীতে এক ভাষার কথার কোনো অস্তিত্ব নেই।

কেডি এর একটা চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ইসলামি দর্শনের পুরনো একটা ধারণা: সত্য বোঝার স্তর আলাদা। এলিটদের জন্য দর্শন, সাধারণের জন্য ধর্ম। ইবনে সিনা, ইবনে রুশদের চিন্তায় এর ছাপ আছে।

আর শিয়া ঐতিহ্যে আছে “তাকিয়া”। বিপদের মুখে নিজের আসল বিশ্বাস লুকিয়ে রাখার বৈধতা।

আফগানি ছাত্রদের সাথে কথা বলতো তাদের স্তর বুঝে। একেক জনকে একেক রকম।

তাই তার ছাত্রদের কেউ বলেছে সে অত্যন্ত ধার্মিক। আবার কেউ বলেছে সে ধর্মবিরোধী।

দুইটাই সত্যি। আবার দুইটাই মিথ্যা।

তাহলে কোন আফগানি আসল? হায়দ্রাবাদের? নাকি প্যারিসের?

উত্তর: দুইজনই।

কারণ আফগানির রাজনীতিতে ধর্ম আর জাতীয়তাবাদ দুইটাই ছিলো হাতিয়ার।

যেখানে যেটা কাজ করে।

⸻

আচ্ছা।

আপনাদের আমি আফগানির গল্প বলছি। কিন্ত উরাবির কী হলো? সেটা একটু বলা দরকার না?

উরাবি যুদ্ধে হেরে গেলো। আর বিদ্রোহে হেরে যাওয়া নেতার কপালে সাধারণত কী থাকে, সেটা আমরা সবাই জানি।

উরাবির ফাঁসির আশঙ্কা ছিলো প্রবল।

কিন্ত উরাবির পক্ষে এগিয়ে এলো এমন একজন মানুষ, যার জন্য ব্রিটিশরা প্রস্তুত ছিলো না।

একজন ইংরেজ।

⸻

পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার বলা হয় একজন নারীকে। তার নাম অ্যাডা লাভলেস। বিখ্যাত কবি লর্ড বায়রনের মেয়ে।

আর অ্যাডা লাভলেসের মেয়ে লেডি অ্যান ব্লান্ট।

লেডি অ্যানের স্বামী উইলফ্রিড ব্লান্ট। কবি, অভিযাত্রী, আরব-প্রেমী এক অভিজাত। লন্ডনের ক্ষমতার বৃত্তে যার অবাধ যাতায়াত।

উরাবির ফাঁসি ঠেকাতে যারা লড়েছিলেন, তাদের সামনের সারিতে ছিলেন এই ব্লান্ট। নিজের পকেট থেকে উকিল জোগাড় করেছিলেন উরাবির জন্য।

শেষ পর্যন্ত উরাবির ফাঁসি হয়নি। নির্বাসন হয়েছিলো সিলোনে।

আর পরের বছর, ১৮৮৩ সালে, ব্লান্ট নিজের দেশকে উদ্দেশ করে লিখলেন:

The Empire thou didst build shall be divided.

Thou shalt be weighed in thine own balances.

(যে সাম্রাজ্য তুমি গড়েছো, তা ভাগ হয়ে যাবে।

তোমার নিজের দাঁড়িপাল্লাতেই তোমাকে মাপা হবে।)

ব্রিটেনকে উদ্দেশ করে লেখা, ১৮৮৩ সালে, সাম্রাজ্য যখন চূড়ায়।

মাত্র ৬৪ বছর পর ভারত স্বাধীন হলো।

আর হলো ঠিক যেভাবে ব্লান্ট লিখেছিলেন।

ভাগ হয়ে।

⸻

এখানে বলে রাখা দরকার, আফগানির পত্রিকার খরচ সম্ভবত আংশিক জোগাতেন এই উইলফ্রিড ব্লান্ট।

চিন্তা করেন…মুসলিম জাগরণের জন্য ছাপা হচ্ছে একটা পত্রিকা…সেটাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করছে একজন ব্রিটিশ।

আফগানির জীবনে নর্মাল বলে আসলে কোনো কিছু ছিলো না।

⸻

আফগানি যখন প্যারিসে বসে ইসলামি ঐক্যের কথা লিখছে, ঠিক তখন আফ্রিকার মরুভূমিতে ঘটছে এমন এক ঘটনা, যা তার তত্ত্বের জীবন্ত প্রমাণ হয়ে দাঁড়ালো।

সুদান।

ষাট বছর ধরে সুদান তুর্কি-মিশরীয় শাসনের অধীনে।

খাজনা আদায়ের পদ্ধতি ছিলো একটা চামড়ার চাবুক। আরবিতে যাকে বলে “কুরবাজ”।

খাজনা না দিতে পারলে চাবুক। ফসল না হলে চাবুক।

আর মরুভূমির গোত্রগুলো? নিজেদের মধ্যে রক্তের শত্রুতা। এক গোত্র আরেক গোত্রের পেছনে দাঁড়াবে না।

এমন সময় নীল নদের এক দ্বীপে নৌকা বানানো এক কারিগরের ছেলে মুখ খুললো।

নাম তার:মুহাম্মদ আহমদ। সুফি সাধক। নিরিবিলি মানুষ।

১৮৮১ সালের জুন।

মুহাম্মদ আহমদ ঘোষণা দিলেন: আমি ইমাম মাহদি। প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তা।

সময়টাও খেয়াল করেন। হিজরি তেরোশো সাল তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। নতুন শতাব্দী। আর মুসলিমদের একাংশের লোকবিশ্বাসে শতাব্দীর মোড়ে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের প্রত্যাশা থাকে।

⸻

তিনি কি সত্যিই বিশ্বাস করতেন তিনি মাহদি?

নাকি জানতেন…এটা একটা গল্প। নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

কিন্ত একবার তার জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখেন।

আপনার সামনে এক ভাঙা দেশ। চাবুকের দাগে ভরা পিঠ। একে অপরের গলা কাটতে প্রস্তুত গোত্র। আর ওপাশে মিশরের কামান, পেছনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য।

আপনি যদি বলেন, “আমি মুহাম্মদ আহমদ, চলেন একসাথে লড়ি”…কে শুনবে?

আপনি তো শুধু আরেকজন মানুষ। আরেক গোত্রের মানুষ।

কিন্ত আপনি যদি বলেন, “আমি সেই, যার জন্য তোমাদের দাদারা অপেক্ষা করেছে। তার দাদারা অপেক্ষা করেছেম যার কথা তোমাদের মায়েরা বলে গেছে।”

তখন?

তখন গোত্রের পরিচয়ের ওপরে উঠে আসে আরেকটা পরিচয়। শত্রুতার ওপরে উঠে আসে আরেকটা আনুগত্য।

থাকে একটা পতাকা।

যদি এটা মিথ্যা হয়েও থাকে…হয়তো এর চেয়ে বড় কোনো সত্য তার হাতে ছিলো না। যে মানুষের হাতে কামান নেই, টাকা নেই, রাজ্য নেই…তার হাতে থাকে শুধু বিশ্বাস।

নিজের হোক বা অন্যের।

⸻

আর বিশ্বাস কাজ করলো।

মরুভূমির বহু গোত্র, যারা নিজেদের মাঝে মারামারি করে যুগ পার করেছে…তারা এক পতাকার নিচে এলো।

ধর্মের পতাকা।

১৮৮৩ সালের নভেম্বর। ব্রিটিশ অফিসার হিক্স পাশার নেতৃত্বে মিশরের হাজার হাজার সৈন্যের বাহিনী মাহদিকে দমন করতে গেলো। বাহিনীটা প্রায় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো।

লন্ডন নড়েচড়ে বসলো।

আর পাঠালো তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষদের একজনকে।

চার্লস গর্ডন।

চীনে বিশাল এক বিদ্রোহ দমন করে নাম কামানো জেনারেল। ব্রিটেনের ঘরে ঘরে তার নাম। আর মজার ব্যাপার, কয়েক বছর আগে এই গর্ডনই ছিলেন সুদানের গভর্নর জেনারেল।

সুদান তার চেনা মাটি।

১৮৮৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গর্ডন পৌঁছালেন খার্তুমে।

⸻

তারপর মাহদির বাহিনী শহর ঘিরে ফেললো।

এক মাস। দুই মাস। ছয় মাস।

খার্তুমের রসদ ফুরিয়ে আসছে। মানুষ ঘোড়া খাচ্ছে, তারপর গাধা, তারপর ইঁদুর। নীল নদ দিয়ে কোনো নৌকা আসে না।

আর গর্ডন অপেক্ষা করছেন উত্তরের দিকে তাকিয়ে।

লন্ডন কি তাকে ভুলে গেছে?

লন্ডনে তখন তর্ক চলছে। উদ্ধারকারী বাহিনী পাঠানো হবে, কি হবে না। পাঠালে কতো খরচ। কে দায় নেবে।

মাসের পর মাস তর্ক।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি গর্ডন তার দিনলিপিতে লিখলেন, প্রায় এরকম: দশ দিনের মধ্যে সাহায্য না এলে শহর পড়ে যেতে পারে। আমি দেশের সম্মানের জন্য আমার সবটুকু করেছি।

বিদায়।

⸻

২৬ জানুয়ারি, ১৮৮৫। শেষ রাত।

নীল নদের পানি নেমে গেছে। নদীর ধারের প্রতিরক্ষা দুর্বল। আর সেই পথ দিয়ে ঢুকে পড়লো মাহদির বাহিনী।

গর্ডন তখন গভর্নরের প্রাসাদে।

ব্রিটিশদের স্মৃতিতে তার শেষ মুহূর্তের একটা ছবি অমর হয়ে আছে।

বলা হয়, তিনি সাদা পোশাক পরে প্রাসাদের সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। নিচে বর্শা হাতে উঠে আসছে মরুভূমির মানুষ।

ইতিহাসবিদরা অবশ্য তার মৃত্যুর সঠিক দৃশ্য নিয়ে একমত নন।

কিন্ত দৃশ্যটা একবার কল্পনা করেন।

যে মানুষটা চীনের সাম্রাজ্য কাঁপানো বিদ্রোহ দমন করেছেন…যে মানুষটা একদিন এই সুদানকেই শাসন করেছেন…যাকে লন্ডন পাঠিয়েছিলো এক সুফি দরবেশের “ঝামেলা” সামলাতে…

সেই মানুষটা হয়তো শেষ মুহূর্তে একটা কথাই ভাবছিলেন।

এ কীভাবে সম্ভব?

এক নৌকা কারিগরের ছেলে। কোনো কারখানা নেই। কোনো সাম্রাজ্য নেই। তার বাহিনীর শক্তির উৎস একটা বিশ্বাস।

আর সেই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ বাহিনীর হাতেই মৃত্যু হলো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যের এক কিংবদন্তি জেনারেলের।

তারপর সব শেষ।

গর্ডনের মাথা কেটে নিয়ে যাওয়া হলো মাহদির কাছে।

⸻

ব্রিটিশ উদ্ধারকারী বাহিনীর অগ্রবর্তী দল খার্তুমের কাছে পৌঁছালো দুই দিন পর।

দুই দিন।

মাসের পর মাস তর্কের দাম। দুই দিন দেরি। আর একটা লাশ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যার সূর্য কখনো অস্ত যায় না…সেই সাম্রাজ্য সুদানের মরুভূমিতে মুখ থুবড়ে পড়লো।

আর মাহদি?

খার্তুম জয়ের মাত্র পাঁচ মাস পর অসুখে মারা গেলেন।

ত্রাণকর্তা নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না।

⸻

এবার আফগানির দিকে তাকান।

এক মানুষ, যে নিজের নাম, দেশ, মাজহাব সব আড়াল করেছে একটা লক্ষ্যের জন্য।

আরেক মানুষ, যে নিজেকে ঘোষণা করেছে প্রতিশ্রুত ত্রাণকর্তা।

দুজনের কেউ কাউকে কোনোদিন দেখেনি।

কিন্ত দুজনের রাজনীতিতেই একটা মিল।

ভাঙা মানুষকে এক করতে শুধু যুক্তি যথেষ্ট না। লাগে বিশ্বাস।

উরাবি মিশরীয় জাতীয়তাবাদের পতাকা তুলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত সামরিক পরাজয়।

মাহদি ধর্মের নামে লড়েছিলেন। খার্তুম পড়েছিলো।

আফগানি দেখলো। এবং বুঝলো।

তার হাতিয়ার কাজ করে।

⸻

এবার আসেন এই গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত অধ্যায়ে।

সুদানে নাস্তানাবুদ ব্রিটেন। আর ব্লান্ট চাইছিলেন ব্রিটেন শান্তিপূর্ণভাবে সুদান থেকে সরে আসুক।

তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো।

আফগানিকে মধ্যস্থতাকারী বানালে কেমন হয়?

আফগানি ব্লান্টের মনের কথা বুঝে ফেললো। এবং দাবি করলো, ইমাম মাহদির সাথে তার যোগাযোগ আছে।

কেডির ভাষায়, এই যোগাযোগের কোনো দলিল আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

মিথ্যা? হতে পারে।

কিন্ত একটু থামেন।

একবার আফগানির জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখেন।

________

বয়স তখন পঁয়তাল্লিশের ঘরে। লোকটার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। নিজের জন্মভূমি ইরানকে সে অস্বীকার করেছে। আফগানিস্তান তাকে বের করে দিয়েছে। ইস্তাম্বুল বের করে দিয়েছে। মিশর বের করে দিয়েছে। ভারতে নজরবন্দি করে রেখেছে।

সেনাবাহিনী নেই। টাকা নেই। যে পত্রিকা সে চালাতো, সেটাও অন্যের অর্থে চলতো। সেটাও বন্ধ।

ছাত্ররা জেলে, নয়তো নির্বাসনে। উরাবি সিলোনে।

তার কাছে আছে শুধু একটা জিনিস।

কথা।

আর এখন, জীবনে প্রথমবার, যে সাম্রাজ্যকে সে এত বছর ধরে ধ্বংস করতে চেয়েছে, সেই সাম্রাজ্যের দরজা খুলে যাচ্ছে তার জন্য।

দরজার ওপাশে বসে আছে সেই মানুষগুলো, যাদের এক কলমের খোঁচায় মিশর দখল হয়, সুদানে সৈন্য যায়, ভারতের ভাগ্য লেখা হয়।

দরজাটা খোলা রাখার একটাই চাবি।

মাহদি।

সে কী বলবে?

“না, আমি মাহদিকে চিনি না”?

আর দরজাটা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে?

নাকি বলবে, “হ্যা। চিনি।”

……….??

যার হাতে তলোয়ার নেই, তার হাতে থাকে শুধু গল্প।

আর আফগানি তো সারা জীবন গল্পই বলে এসেছে। নিজের নাম নিয়ে। নিজের দেশ নিয়ে। নিজের মাজহাব নিয়ে।

এবারের গল্পটা শুধু একটু বড়।

ব্লান্ট আফগানিকে নিয়ে গেলেন লন্ডনে। ব্রিটিশ সরকারের নেতাদের সাথে বৈঠক।

পরিকল্পনা হলো, এক ব্রিটিশ কূটনীতিকের সাথে আফগানি যাবে ইস্তাম্বুলে। মিশর থেকে ব্রিটিশ সৈন্য আংশিক সরিয়ে নেওয়ার আলোচনায়।

কিন্ত…সেই পরিকল্পনাও ভেস্তে গেলো। দরজাটা খুলেছিলো।

কিন্ত ভেতরে ঢোকা হলো না।

⸻

“আল-উরওয়া আল-উসকা” টিকেছিলো মাত্র আট মাস। আঠারোটা সংখ্যা।

আবদুহু ততদিনে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে। উরাবির পরাজয় দেখেছে। জেল খেটেছে। নির্বাসনে গেছে।

আর দেখেছে ওস্তাদের একের পর এক বিপ্লবের পরিকল্পনা, একের পর এক ব্যর্থতা। আবদুহুর মনে হলো, সমস্যাটা অন্য জায়গায়।

যে জাতি নিজেই অশিক্ষিত, কুসংস্কারে ডুবে আছে…তাকে নিয়ে বিপ্লব হয় না।

আগে মানুষ গড়তে হবে। স্কুল লাগবে। শিক্ষা লাগবে।

শোনা যায়, আবদুহু প্রস্তাব দিয়েছিলো…

-/চলেন…রাজনীতি ছেড়ে কোনো নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে একদল ছাত্র তৈরি করি। বিপ্লব ওরাই করবে। বিপ্লব করার আগে তো বিপ্লবী বানাতে হবে?

আফগানি উড়িয়ে দিয়েছিলো।

তার কাছে সময় নেই। বিপ্লব চাই। এখনই।

আবদুহু ফিরে গেলো বৈরুতে। শিক্ষার পথে।

আর আফগানি?

⸻

১৮৮৬ সালের বসন্ত।

ইরানের বুশেহর বন্দরে একটা জাহাজ ভিড়লো।

জাহাজ থেকে নামলো এক মানুষ। যে বহু বছর আগে এই দেশ ছেড়েছিলো, আর সারা দুনিয়াকে বলে বেড়িয়েছে সে আফগান।

তার নাম…জামাল-আল-দিন।

আসাদাবাদে তার বাড়ি। ইরান তার মাতৃভূমি।

⸻

১৮৯০ সালের মার্চ।

শাহ নাসির উদ্দিনের টাকা দরকার।

আর টাকা দিতে, বিনিয়োগ করতে রাজি এক ব্রিটিশ। মেজর জেরাল্ড ট্যালবট।

চুক্তি হলো। পঞ্চাশ বছরের জন্য ইরানের পুরো তামাক ব্যবসার একচেটিয়া অধিকার ট্যালবটের কোম্পানির।

চাষি তামাক ফলাবে, কিন্ত বেচতে পারবে শুধু কোম্পানির কাছে। কোম্পানির দামে।

দোকানদার বেচতে পারবে শুধু কোম্পানির লাইসেন্সে।

পুরো দেশের হুক্কায় যে তামাক জ্বলবে, তার প্রতিটা দানা যাবে এক বিদেশি কোম্পানির হাত দিয়ে।

তখনকার ইরানে তামাক মানে শুধু নেশা না। তামাক মানে গোটা সমাজ।

হুক্কা ছাড়া মেহমানদারি হয় না। বাজারের লেনদেন হয় না। আর লাখো মানুষের রুটিরুজি তামাকের সাথে বাঁধা।

মিশর বিক্রি হয়েছিলো ঋণের কাছে। ইরান বিক্রি হচ্ছে তামাকের কাছে।

⸻

আফগানি চুপ থাকলো না।

তেহরানে তার চারপাশে জমে উঠলো একদল তরুণ জাতীয়তাবাদী। আর আফগানি তাদের শেখালো সেই জিনিস যা সে কায়রোতে শিখেছিলো।

গোপন সংগঠন। গোপন লিফলেট।

__________

১৮৯০ সালের গ্রীষ্মে আফগানি খবর পেলো, শাহ তাকে দেশ থেকে বের করার পরিকল্পনা করছেন।

সে আশ্রয় নিলো তেহরানের দক্ষিণে শাহ আবদুল আজিমের মাজারে।

ইরানের পুরনো রীতি, যাকে বলে “বাস্ত”।

পবিত্র মাজারে আশ্রয় নিলে শাহের সৈন্যও সাধারণত সেখানে হাত দেয় না।

প্রায় সাত মাস।

মাজারের ভেতর থেকে আফগানি কথা বলে গেলো। শিষ্যরা আসে, শোনে, ফিরে যায়।

আর তেহরানের অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়ে কথা।

মাজারটার নাম মনে রাখবেন। শাহ আবদুল আজিম।

এই গল্পে এই মাজার আরেকবার ফিরে আসবে।

⸻

১৮৯১ সালের জানুয়ারি।

তেহরানে একটা লিফলেট ছড়িয়ে পড়লো। শাহের সরকার বিদেশিদের কাছে দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে। একের পর এক কনসেশন। তার মধ্যে তামাক।

শাহ রাগে ফেটে পড়লেন। সন্দেহ গেলো এক দিকেই।

এবার আর রীতিনীতির তোয়াক্কা না। শাহের লোকজন মাজারে ঢুকলো। আফগানিকে টেনে বের করলো।

তারপর শীতের মাঝে, বরফের ভেতর দিয়ে, জোর করে নিয়ে যাওয়া হলো ইরাকের দিকে।

ছুড়ে ফেলা হলো দেশের বাইরে।

⸻

আফগানি হার মানলো না।

ইরাকে বসে লিখলো তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত চিঠিগুলোর একটা।

প্রাপক: হাজি মির্জা হাসান শিরাজি।

ইরাকের সামাররায় বসে থাকা শিয়া দুনিয়ার সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষদের একজন। যার একটা কথা আইনের চেয়ে বেশি।

চিঠিতে আফগানি শাহের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় তুললো। দেশ বিক্রি, বিদেশিদের হাতে মুসলমানদের সম্পদ তুলে দেওয়া।

আর ডাক দিলো, এই শাহকে থামাও।

⸻

চিঠির পর কয়েক মাস কেটে গেলো।

তারপর ১৮৯১ সালের ডিসেম্বর।

শিরাজির নামে একটা ফতোয়া ছড়িয়ে পড়লো ইরানজুড়ে।

তামাক ব্যবহার নিষিদ্ধ।

এরপর যা ঘটলো, ইরানের ইতিহাসে তার আগে খুব কমই ঘটেছে।

দেশজুড়ে মানুষ তামাক বর্জন শুরু করলো।

তেহরানের বাজার বন্ধ। দোকানে দোকানে হুক্কা ভাঙা। যে দেশে মেহমানকে হুক্কা না দেওয়া অপমান, সেই দেশে কেউ হুক্কা ছোঁয় না।

বণিকরা ব্যবসা বন্ধ করছে। আলেমরা মানুষকে সংগঠিত করছে। রাস্তায় বিক্ষোভ হচ্ছে।

বলা হয়, শাহের নিজের হারেমেও হুক্কা নিভে গিয়েছিলো।

যে শাহ সারা দেশের মালিক…তিনি নিজের ঘরে একটা হুক্কা জ্বালাতে পারছেন না।

আন্দোলন পুরোপুরি রক্তপাতহীন ছিলো না। তেহরানে সরকারি বাহিনীর গুলিতে প্রাণও গেলো।

কিন্ত শেষ পর্যন্ত জয় হলো আন্দোলনকারীদের।

১৮৯২ সালের জানুয়ারি। শাহ চুক্তি বাতিল করলেন।

⸻

তামাক আন্দোলনে আফগানির ভূমিকা কতোটা, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে তর্ক আছে।

কেডির মতে, আফগানির প্রভাব ছিলো, কিন্ত সে একা এর স্থপতি না।

কিন্ত এই আন্দোলন যা প্রমাণ করলো, সেটা আফগানির তত্ত্বের একটা বড় অংশ।

উরাবি জাতীয়তাবাদের নামে লড়েছিলেন। সামরিকভাবে পরাজিত।

মাহদি ধর্মের নামে লড়েছিলেন। খার্তুম পড়েছিলো।

আর ইরানে ধর্মীয় ফতোয়া আর বাজারের সম্মিলিত প্রতিরোধের সামনে শাহ মাথা নোয়ালেন।

আর এই আন্দোলনে ইরানের আলেমরা আবিষ্কার করলো একটা জিনিস।

তারা যদি বাজারের সাথে হাত মেলায়, তাহলে শাহকেও মাথা নোয়াতে হয়।

এই আবিষ্কার থেমে থাকেনি। কিন্ত সেই গল্প অনেক পরে।

⸻

আফগানি তখন লন্ডনে।

শাহের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিচ্ছে, পত্রিকায় লিখছে। ইরানের আলেমদের কাছে খোলা চিঠি পাঠাচ্ছে: এই শাহকে সরাও।

তার বুকে তখন শুধু রাজনীতি না।

ব্যক্তিগত প্রতিশোধও।

মাজার থেকে টেনে বের করার অপমান। বরফের ভেতর দিয়ে হাঁটানোর অপমান।

১৮৯২ সালে ইস্তাম্বুল থেকে দাওয়াত এলো। উসমানি সুলতান আব্দুল হামিদের দরবার থেকে।

দাওয়াতে মিষ্টি কথা ছিলো। আবার হুমকিও ছিলো।

আফগানি গেলো।

সুলতান তাকে দিলেন বাড়ি। দিলেন মাসোহারা। কিন্ত স্বাধীনভাবে লেখা প্রকাশের অনুমতি দিলেন না।

সোনার খাঁচা। কিন্ত খাঁচা।

⸻

এমন সময় ইস্তাম্বুলে আফগানির দরজায় এসে দাঁড়ালো এক মানুষ।

মির্জা রেজা কেরমানি।

আফগানির পুরনো চাকর। পুরনো শিষ্য। তেহরানের দিনগুলোতে যারা আফগানির পায়ের কাছে বসতো, তাদের একজন।

সদ্য ইরানের জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে।

মনে আগুন।

ওস্তাদ আর শিষ্য মুখোমুখি বসলো। কি কথা হয়েছিলো, তার পুরোটা আমরা জানি না।

মির্জা রেজা ফিরে গেলো ইরানে।

⸻

১ মে, ১৮৯৬।

শাহ নাসির উদ্দিন তখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক বিশাল উৎসবের। চান্দ্র হিসাবে তার সিংহাসনে বসার পঞ্চাশ বছর পূর্তি।

উৎসবের আগে শাহ গেলেন একটা মাজারে জিয়ারত করতে।

শাহ আবদুল আজিমের মাজার।

হ্যা। সেই মাজার।

যেখান থেকে পাঁচ বছর আগে আফগানিকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয়েছিলো।

……..

মাজারের ভেতরে ভিড়ের মাঝ থেকে এক লোক এগিয়ে আসছে। হাতে একটা আরজির কাগজ। যেন শাহের কাছে কোনো আবেদন জানাবে।

মির্জা রেজা কেরমানি।

তারপর গুলি।

পঞ্চাশ বছরের শাসনের উৎসব আর হলো না।

ইরানের শাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

আর উঠলেন না।

যে মাজার আফগানিকে আশ্রয় দিতে পারেনি…সেই মাজারেই শাহ আশ্রয় পেলেন না।

⸻

মির্জা রেজা ধরা পড়লো।

আর ইরানের সরকার দাবি তুললো: আফগানিকে আমাদের হাতে তুলে দাও। সে ইরানি নাগরিক। এই হত্যার পেছনে সে।

সুলতান আব্দুল হামিদ রাজি হলেন না।

কিন্ত কী অজুহাতে ফেরালেন জানেন?

সুলতান বললেন, এই লোক ইরানি না। সে আফগান।

তাকে ইরানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

যে মিথ্যা পরিচয় আফগানি সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছে…সেই মিথ্যাই হয়ে দাঁড়ালো তার ঢাল।

আহ আফগানি! বাহ আফগানি!

⸻

ইস্তাম্বুলের সোনার খাঁচায় বসে আছে এক বুড়ো মানুষ।

চোয়ালে ব্যথা। দিন দিন বাড়ছে।

বাইরে দুনিয়া তাকে খুঁজছে। ইরান চায় তার ফাঁসি। সুলতান চায় তার মুখ বন্ধ থাকুক।

সে হয়তো ভাবছে, সব শেষ। সব ব্যর্থ।

কাবুল, কায়রো, প্যারিস, তেহরান…কোথাও কিছু টিকলো না।

কিন্ত সে জানে না।

কায়রোর যে ক্যাফেতে একদিন সে তরুণদের মাথায় আগুন ঢুকিয়েছিলো…সেই আগুন নেভেনি।

আবদুহুর হাত ঘুরে, কখনো সরাসরি, কখনো উত্তরাধিকারের সূত্র ধরে, সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ছে তিনটি ভিন্ন ধারায়।

তিনটা মশাল।

একজনের মশালে লেখা: মিশর।

সে একদিন মিশরকে জাগাবে মিশরের নামেই।

তার আন্দোলনে মসজিদ আর গির্জা থেকে উঠবে একই দেশের স্বাধীনতার দাবি। পতাকায় চাঁদ আর ক্রুশ পাশাপাশি।

একজনের মশালে লেখা: নারী।

সে বলবে, যে জাতির অর্ধেক মানুষ ঘরে বন্দি, সে জাতি কোনোদিন স্বাধীন হয় না। পর্দার আড়াল থেকে সে টেনে আনবে আরব দুনিয়ার এক নিষিদ্ধ প্রশ্ন।

আর একজনের মশালে লেখা: আল্লাহ।

সে বের করবে এক পত্রিকা। নাম দেবে বাতিঘর।

আর সেই বাতিঘরের আলোয় পথ খুঁজে পাবে এক তরুণ স্কুলশিক্ষক। যে একদিন গড়বে এক ভ্রাতৃসংঘ।

ব্রাদারহুড।

এক আগুন। তিন মশাল। তিন রাস্তা।

একটা রাস্তা যায় পতাকার দিকে।

একটা রাস্তা যায় বন্ধ দরজা খোলার দিকে।

আর একটা রাস্তা যায়…

সেই রাস্তা কোথায় গিয়ে থেমেছে, আমরা সবাই জানি।

থেমেছে কি না, সেটাই বরং প্রশ্ন।

আর যে মানুষটা আগুনটা জ্বেলেছিলো, সে তখন ইস্তাম্বুলের এক ঘরে বসে গুনছে নিজের শেষ নিঃশ্বাসগুলো।

জামাল-আল-দিন-আল-আফগানির হাতে তখন আর বেশি সময় নেই।

Share:FacebookWhatsApp

আরও দেখুন