নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার, যা সাধারণভাবে পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার নামে পরিচিত, প্রাচীন বাংলার শিক্ষা, ধর্ম ও স্থাপত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। বিস্তৃত প্রত্নপ্রাঙ্গণ, কেন্দ্রীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ এবং পোড়ামাটির ফলক দেখে এখানে একসময় গড়ে ওঠা জ্ঞানচর্চার বৃহৎ কেন্দ্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হওয়ায় স্থানটির আন্তর্জাতিক গুরুত্বও রয়েছে।
পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ইতিহাস
অষ্টম শতকে পাল রাজবংশের শাসনামলে সোমপুর মহাবিহার নির্মিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় জানা যায়। পাল শাসকেরা বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কয়েক শতাব্দী ধরে এই মহাবিহার দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং দূরদূরান্ত থেকে ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীরা এখানে আসতেন। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সংঘাতের ফলে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়ে। প্রত্নখননের মাধ্যমে এর বিশাল পরিকল্পনা আবার দৃশ্যমান হয়।
স্থাপত্য ও প্রত্ননিদর্শন
বিহারটির পরিকল্পনা একটি বৃহৎ চতুষ্কোণ প্রাঙ্গণকে ঘিরে। চারপাশে মোট ১৭৭টি কক্ষের চিহ্ন পাওয়া যায়, যেগুলো ভিক্ষুদের আবাস ও অধ্যয়নের কাজে ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়। মাঝখানে ধাপে ধাপে উঁচু হয়ে ওঠা কেন্দ্রীয় মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। দেয়াল ও ভিত্তির বিভিন্ন অংশে মানুষ, প্রাণী, ফুল, পৌরাণিক চরিত্র এবং দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্যসম্বলিত পোড়ামাটির ফলক ছিল। এসব নিদর্শন প্রাচীন বাংলার শিল্প ও সমাজ সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা দেয়।
কী কী দেখবেন
- কেন্দ্রীয় মন্দিরের বিশাল ভিত্তি ও প্রদক্ষিণপথ
- চারপাশের সারিবদ্ধ ভিক্ষুকক্ষ ও টানা বারান্দার কাঠামো
- প্রধান উত্তর ফটক ও প্রাচীন হলঘরের চিহ্ন
- পোড়ামাটির ফলক ও প্রত্নখননে পাওয়া স্থাপত্যাংশ
- সংলগ্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত ভাস্কর্য, মুদ্রা ও অন্যান্য নিদর্শন
- কাছাকাছি সত্যপীরের ভিটা ও অন্যান্য প্রত্নস্থল
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে নওগাঁ বা জয়পুরহাট পৌঁছে স্থানীয় বাস, সিএনজি বা রিজার্ভ গাড়িতে পাহাড়পুর যাওয়া যায়। রেলপথে জয়পুরহাট বা জামালগঞ্জের কাছাকাছি স্টেশন ব্যবহার করে পরবর্তী অংশ স্থানীয় যানবাহনে যেতে পারেন। নওগাঁ শহর থেকেও বদলগাছী হয়ে পাহাড়পুরের গাড়ি পাওয়া যায়। রুট, ভাড়া ও সময়সূচী বদলাতে পারে, তাই যাত্রার আগে বর্তমান তথ্য জেনে নিন।
প্রবেশের সময় ও সেরা মৌসুম
প্রত্নস্থল ও জাদুঘরের খোলা থাকার সময়, সাপ্তাহিক ছুটি এবং টিকিটের মূল্য সরকারি সিদ্ধান্তে পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে জাদুঘরের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন আগে যাচাই করা জরুরি। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খোলা প্রাঙ্গণে হাঁটা আরামদায়ক। সকাল বা বিকেলে নরম আলোয় স্থাপত্যের স্তর ও ইটের রং সুন্দর দেখা যায়। দুপুরের রোদে ছায়া কম থাকায় ছাতা, টুপি ও পানি রাখুন।
কোথায় থাকবেন ও খাবেন
পাহাড়পুর এলাকায় সীমিত মানের খাবার ও থাকার ব্যবস্থা থাকতে পারে। নির্ভরযোগ্য আবাসনের জন্য নওগাঁ বা জয়পুরহাট শহর সুবিধাজনক। স্থানীয় বাজারে সাধারণ খাবার পাওয়া গেলেও পরিবার নিয়ে গেলে খাবারের পরিচ্ছন্নতা যাচাই করুন। ছুটির দিনে পর্যটকের চাপ থাকলে আগে থেকে কক্ষ বুক করা ভালো।
ভ্রমণ শিষ্টাচার
- প্রত্নস্থাপনার দেয়াল বা কেন্দ্রীয় মন্দিরের নিষিদ্ধ অংশে উঠবেন না।
- পোড়ামাটির ফলক বা আলগা ইট স্পর্শ ও সরানো থেকে বিরত থাকুন।
- ড্রোন ও পেশাদার চিত্রধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিন।
- জাদুঘরের ভেতরে ফটোগ্রাফির নিয়ম অনুসরণ করুন।
- খাবারের প্যাকেট ও প্লাস্টিক নির্ধারিত স্থানে ফেলুন।
কাছাকাছি কোথায় ঘুরবেন
সময় থাকলে নওগাঁর কুসুম্বা মসজিদ, জগদ্দল মহাবিহারের এলাকা অথবা জয়পুরহাটের আশপাশের প্রত্নস্থান ভ্রমণ পরিকল্পনায় যোগ করা যায়। দূরত্ব বিবেচনায় দুই দিনের সফর করলে তাড়াহুড়ো কম হবে।
পাহাড়পুরে দাঁড়ালে শুধু ইটের ধ্বংসাবশেষ দেখা হয় না; দেখা হয় প্রাচীন বাংলার শিক্ষা, শিল্প ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক বিস্মৃত অধ্যায়। তাই দ্রুত ঘুরে না গিয়ে সময় নিয়ে প্রতিটি স্তর দেখা এবং জাদুঘর পরিদর্শন করাই এই ভ্রমণের আসল আনন্দ।
পোস্ট সর্বশেষ হালনাগাদ: 26 September 2026
আপনার তোলা ছবি জমা দিন
Google দিয়ে লগইন করলে ছবি জমা, পয়েন্ট ও নিজের তথ্য সব ডিভাইসে পাবেন।
তথ্য সহযোগী
স্থানীয় বা আগে ঘুরে আসা মানুষের কাছ থেকে তথ্য জেনে নিন। এটি গাইড বুকিং বা অর্থের বিনিময়ে সেবা নয়।
তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে চাই
Google দিয়ে লগইন করলে ছবি জমা, পয়েন্ট ও নিজের তথ্য সব ডিভাইসে পাবেন।
প্রশ্ন–উত্তর
একটি প্রশ্ন করুন
তথ্য বদলেছে? জানান
রিভিউ
এখনও কোনো রিভিউ নেই। প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!